Bristier Raat Short Story-bengali



এখন বৃষ্টির রাত
        - জুয়েল আশরাফ




হোম কোয়ারেন্টিনের এগারো দিন পর রাইদার হবু বরের খবর এলো। বাড়ির সবাই আতঙ্কিত আর উদ্বিগ্ন। একচেটিয়া গালিগালাজ চলতে থাকে ওসমানের ওপর। ওসমান হলো রাইদার আপন ছোট চাচা। বিয়ের সম্বন্ধটা তিনিই এনেছেন। ইতালি থেকে আসা ছেলের সম্বন্ধ আসাতে বাড়ির সবাই রাজি। তড়িঘড়ি করে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক। দেশের পরিস্থিতি ঠিক হয়ে গেলেই বিয়ে। হবু বরের সঙ্গে রাইদার কথা হতো নিয়মিত। ফোন করে জামানই কথা বলত, রাইদা শুধু হুম-হ্যাঁ করত। তার ভীষণ লজ্জাই হতো জামানের সঙ্গে কথা বলতে। চারদিন আগেও কথা হয়েছে। জামান সেদিন বলছিল- রাইদা তুমি কি আজকেও চুপ করে থাকবে? কিছু বলো।

রাইদা লজ্জা মেশানো গলায় বলল- কী বলব?
-যা ইচ্ছে বলো। আমি তোমার যে কোনো কথা শুনব। তোমার মুখে গল্প শুনতে আমার ভালো লাগবে।
-আমি গল্প পারি না।
-আমি একটা গল্প বলি শুনবে?
-শুনব।
জামান গল্প বলল। বউ-শাশুড়ির গল্প। রম্য গল্প। শুনে রাইদা মুখ চেপে হাসল। এরপর জামান বলল- দেশে কী একটা মহামারি অবস্থা। ইতালি থেকে এলাম বিয়ের জন্যে। বউ পাওয়া গেল। কিন্তু বিয়ে আটকে গেল। এই মহামারি কবে শেষ হবে, কবে বউ কাছে পাব! আর দেরি সহে না।

এই জাতীয় কথায় রাইদার ফর্সা কান লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। তারপর জামান বলল- তোমার মায়ের কাছে শুনেছি একদিন বৃষ্টির রাতে একা ঘুমিয়েছো। হঠাৎ দেখো তোমার পাশে সাদা কাপড় পড়ে কে শুয়ে আছে। চিৎকার দিয়ে তুমি জ্ঞান হারাও। বাড়ির লোকজন দরজা ভেঙ্গে তোমাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়। তারপর থেকে একা ঘুমাতে আর সাহস হয় না তোমার। সেদিন রাতে কাকে দেখেছো রাইদা?

রাইদা কিছুটা অবাক হয়। এই ঘটনা হবু বরকে মা জানিয়েছেন! রাইদা বলল- আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বিয়ের চারদিন আগে সেই ছেলেটি মোটরবাইক দূর্ঘটনায় মারা যায়। সে একহাতে আমার সঙ্গে কথা বলছিল ফোনে, অন্য হাতে বাইক চালাচ্ছিল। বৃষ্টির রাত ছিল সেদিন। এই ঘটনার পর আমি রাতে একা ঘুমাতে গেলেই তাকে আমার বিছানায় দেখতাম।
-কী সাংঘাতিক! শুনেই তো ভয় লাগছে!
-প্রায় দুই মাস আমার চিকিৎসা হয়। বৃষ্টির রাতগুলোতেই আমার ভয় বেশি।
জামান আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল- ভয় করো না রাইদা। ওটা তোমার মনের এক ধরনের কল্পনা। ইটস জাস্ট হেলুসিনেশন। আমাদের বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিছুই ঠিক হয়নি। জামানের মৃত্যুর দিন থেকেই ওদের মহল্লার ২৪ টি বাড়ি লকডাউন করে রেখেছে পুলিশ প্রশাসন। কেমন তরতাজা ছেলেটা একদিনের শ্বাসকষ্টে হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা গেল! খবরটা শোনা মাত্রই রাইদার হাত-পায়ে কাঁপুনি এসেছে। ছেলেটি তার হবু বর! মা তাকে বুকের কাছে জড়িয়ে নিয়ে বললেন- এসব ভাবিস না। একটা দুর্ঘটনা। জীবনে কত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। বিয়ের দুদিন পরে স্বামী মরে। তোর তো বিয়ে হয়নি, শুধু পাকা কথা হয়েছে। একদম মন খারাপ করবি না।

এসব সান্ত্বনামূলক কথা বলে বিষয়টাকে হালকা করার চেষ্টা চালান মা।
রাইদা অনেকবার চেষ্টা করেছে- মন খারাপ না হোক। নিজের হবু বরের মৃত্যু ঘটেছে, মন ভারাক্রান্ত হবে খুব স্বাভাবিক। এই কয়েকটা দিন বাড়ির সবাই তাকে আগলে রেখেছে। মনের ওপর কোনোরকম খারাপ প্রভাব না আসে চেষ্টা করে যাচ্ছে সবাই। আজ সকাল এগারোটার দিকে পুলিশের একটি গাড়ি এলো। তাদের বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। কারণ এই বাড়িতে জামান আসা-যাওয়া করেছে। এই বাড়ির প্রতিটা সদস্যের হোম কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক। পুলিশ পুরো বাড়িটাকে লকডাউন ঘোষণা করে। জরুরি কারণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বাইরের কেউ যেমন বাড়িতে ঢুকতে পারবে না, তেমনি বাড়ি থেকেও কেউ চাইলেই বাইরে যেতে পারবে না।

রাতে এখন রাইদা একা ঘরে ঘুমায়। আর ভয় করে না তার। কোনো কোনো রাতে প্রবল বৃষ্টি হয়। আজ বৃষ্টি হচ্ছে। রাত যেন বৃষ্টিদের দখলে। শুধু বৃষ্টি হচ্ছে আর জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জামানের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। রাইদার এখন আর ভয় নেই। পাশে শুয়ে আছে জামান। তার বুকের ওঠানামা স্পষ্ট টের পাচ্ছে।



No comments:

Post a Comment

no spam

 

Copyright © 2016 - | World Books Collect | All Right Reserved| Design by MAS web| Mumbai, India| e-mail:- contact@masexim.in