Dahan dine short story



দহন দিনে....

     - জুয়েল আশরাফ



আব্দুল জলিল সাহেব বিচলিত হয়ে বার বার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন। যোহরের নামাজ শেষ হওয়ার পর মেহমান না আসাতে বড় রাস্তায় কালাম আর সদরকে পাঠিয়ে দিলেন। অবশ্য রাতুলকে আগেই মোড়ে পাঠিয়েছেন। কালাম আর সদর এসে খবর দিল- মেহমানদের গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। যত সময় যাচ্ছে আবদুল জলিল সাহেবের অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। দুপুর থেকেই ঘটককে লাগাতার ফোন করে যাচ্ছেন। সুইচ অফ শোনাচ্ছে। পাত্র পক্ষের কোনো একজনের নম্বর রাখার দরকার ছিল। প্রয়োজনটা এখন দেখা দিচ্ছে। 

আবদুল জলিল সাহেব অস্থির ভঙ্গিতে বাড়ির বাইরে আমগাছটার নিচে বসে পড়লেন। দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনা এই মুহূর্তে গ্রাস করেছে। হাত-পা কাঁপছে। কাঁধের ওপর হাতের স্পর্শ পেয়ে তাকিয়ে দেখেন তার ছোট মেয়ের মলিন মুখ।
লাইজু বলল, আব্বা সকাল থেকে কিছু খাননি। এখন খাবেন আসেন।

আবদুল জলিল সাহেব ছোট মেয়ের সঙ্গে বাড়ির ভেতর এলেন। রোখসানা বেগম বারান্দায় দাঁড়িয়ে  ছিলেন। স্বামীর কাছে এগিয়ে এসে বললেন, কোনো খবর?
-না। কিছু বুঝতে পারছি না। এমন হওয়ার তো কথা নয়।
আবদুল জলিল সাহেব বিছানায় এসে শুয়ে পড়লেন। তাকে ঘিরে রোখসানা বেগম আর ছোটমেয়ে লাইজু দাঁড়িয়ে আছে। 
অল্প পরেই পা টেনে টেনে এই ঘরে এসে ঢুকল বড় মেয়ে রেবা। জন্ম থেকেই সে প্রতিবন্ধী। মেঝের সঙ্গে পা টেনে টেনে হাঁটে। আবদুল জলিল সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। বুকের ভেতরে তার খুব কষ্ট হতে থাকে। মেয়ের চোখমুখ উজ্জ্বল। মুখে প্রসাধনী নেই। কোনো রকম সাজগোজ ছাড়াই সে সুন্দর। তার রূপ গুণের অন্ত নেই। সমস্যা শুধু পায়ের। স্বাভাবিক হাঁটতে না পারার কারণে বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙ্গে যায়। আজ ছেলেপক্ষের বিয়ের পাকা কথা দেওয়ার জন্য আসার কথা। শেষমেশ এই সম্বন্ধটাও পিছিয়ে গেল। আবদুল জলিল সাহেব ভেতরে ভেতরে খুব যন্ত্রণা অনুভব করেন। নিশ্চিতই জীবনে বড় ধরনের গোনাহ করেছেন। তারই খেসারত দিতে হচ্ছে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে।

মাগরিবের আজান হচ্ছে। উঠে মসজিদে যান তিনি।
মসজিদে যাওয়ার পথে সামাজিক কবরস্থান। এই পথ দিয়ে গেলেই তার শরীর শীতল হয়ে আসে। কবরস্থানের দেয়াল ধরে কেঁদে ফেললেন তিনি। নিজের জীবনের গোপন একটা অধ্যায় আছে। যৌবনের প্রারম্ভে মারাত্মক একাটা গোনাহ করেছেন তিনি। তার খবর জানে না কেউ। যদি কেউ জানত নিশ্চিত তার ফাঁসি। গোপন গোনাহের খবর একজনই শুধু জানেন, সেই একজন প্রতিফল দিয়ে যাচ্ছেন। পরকালে আরও কী ভয়ংকর প্রতিফল তার জন্য অপেক্ষা করছে জানা নেই। স্বপ্নে প্রায়ই সেই দৃশ্যটা দেখেন- তার গ্রামের রোকেয়া মেয়েটি। যার দুটো পা অচলের কারণে হাঁটতে পারতো না। রোকেয়ার তখন যৌবন বয়স। বিয়ে হয়নি। একদিন রাতে রোকেয়ার বাবা-মা কেউ ছিল না। প্রবৃত্তির তাড়নায় সেদিন রাতে রোকেয়ার ঘরে গিয়ে...। মেয়েটি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল নিজেকে রক্ষা করতে। যখনই রোকেয়া কেঁদে কেঁদে বলল,  গ্রামসুদ্ধ লোকের কাছে তার কূকীর্তির কথা বলে দেবে: সেই রাতে তাঁর মাথায় আর কিছু আসেনি। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে রোকেয়া তাঁর মানসম্মান বাঁচিয়ে দিয়ে গেল। এই তো রোকেয়া! কতকাল ধরে কবরে ঘুমিয়ে আছে। আর তিনি নিজের সম্মান নিয়ে সমাজে আজও ঠায় দাঁড়িয়ে। বেঁচে থাকতে রোকেয়ার ক্ষতি ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। মেয়েটির জন্য আখেরাতের সমস্ত কল্যাণ কামনা করে যাবেন, যতদিন বেঁচে থাকবেন। ভালো থেকো ওপারে। ক্ষমা করো আমাকে।



No comments:

Post a Comment

no spam

 

Copyright © 2016 - | World Books Collect | All Right Reserved| Design by MAS web| Mumbai, India| e-mail:- contact@masexim.in