ওরা দুইবোন,,
জান্নাতা নিঝুম শিল্পী,,
ঝিনুক আর সানাই দুইবোন। ঝিনুক সানাইয়ের দুই বছরের বড়। ওদের দেখে ছোটবড় মনে হয় না।দুজনই সমান। ঝিনুক খুব ফাজিল! সারাক্ষণ যেকোনো বিষয় নিয়ে সানাইয়ের সাথে ঝগড়া লাগায়। "আমার পুতুল হারিয়েছে,চুলের ফিতা হারিয়েছে,গল্পের বই হারিয়েছে। আর কেউ নেয়নি নিশ্চয় সানাই লুকিয়ে রেখেছে" সানাই তখন বলে, না আমি লুকাইনি। তুমি আমায় মিছে মিছে দোষ দাও।তারপর মাকে ডাকে, মা এসে দুজনের ঝগড়া মিটিয়ে দেয়।
আজ সানাইয়ের খুব মন খারাপ। সানাই খুব শান্ত স্বভাবের মিষ্টি মেয়ে। কিন্তু মন খারাপ করলে তাকে একদমই মানায় না। সে তার আপুর, কাঁচের ছোট পুতুলটা খেলতে নিয়েছিল আজ। কিন্তু হাত ফসকে পড়ে সেটা ভেঙ্গে গেছে। তাই ঝিনুক খুব বকেছে ওকে। সানাই ঝিনুকের কোন জিনিস নিলেও খেলে আবার ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখে। আজ হঠাৎ এমন হলো। ঝগড়া মোটেও তার পছন্দ নয়। তারপরও মনে মনে বলে,আপুর মনটা এমন কেন? সে একটুও মিল বোঝে না। শুধু ঝগড়া বোঝে। ওর তো অনেক পুতুল। লাল,নীল,গোলাপী,সাদা,কত রকমের তাও মন ভরে না। বাবাকে বলব ,আজ একটা অনেক বড় চুলওয়ালা লাল পুতুল আনতে। তারপর পুতুলটা আপুর হাতে দিয়ে বলব, নাও তুমি পুতুল নাও আর কথা দাও আমার সাথে কক্ষণো রাগারাগি করবে না।
পরেরদিন রাতে ঝিনুকের বাবা সত্যি সত্যি একটা বড় কোঁকড়ানো লাল টুকটুকে চুলওয়ালা পুতুল নিয়ে এসেছে। সেটা দেখে সানাই বলল, বাবা তুমি খুব ভালো। এটা আপুর জন্য। আমি এটা নিব না।সানাই এক দৌড়ে ঝিনুকের কাছে গিয়ে বলল, এই নাও তোমার পুতুল। যেটা ভেঙে ছিলাম তার চাইতেও এটা বেশি সুন্দর।
ঝিনুক তখন এক ঝটকা দিয়ে সানাইয়ের হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে আছাড় দিল। বলল,তুই আমার পুতুল ভেঙে আবার ঢঙ করতে এসেছিস? যা এখান থেকে। ঝিনুকের চেঁচামেচি দেখে বাবা আসলেন ওদের কাছে। সানাই মন ভারী করে দাড়িয়ে রইল এক পাশে।
ঝিনুকের বাবা বললেন, কি হয়েছে মা? তোমারা দুটো বোন কোন সময় মিলেমিশে থাকতে পারো না কেন? আমি তো তোমাদের পছন্দের সব আবদার পূরণ করি সাধ্যমত। কোনকিছুর অভাব দিই না।কেন রাগারাগি করো সানাইয়ের সাথে! দেখো না পাশের বাড়ির বৃষ্টি, শিলা জেসমিনরা কোন সময় ঝগড়া করে না। ওদের অনেক মিল। মানুষের দেখেও এগুলো শেখা যায়।
ঝিনুক চুপচাপ বাবার কথাগুলো শুনলো। তারপর সানাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ আগুন ছোটালো। কিছু ভাবতে পারল না কি করবে ও।
রাতে সানাই ঝিনুকের পাশেই ঘুমায়। আজও ঘুমাল।ঝিনুক রাতে একটিও কথা বলল না সানাইয়ের সাথে।রোজ অনেক গল্প করে। স্কুলে কি কি করল সব বিষয়ে। কিন্তু আজ কিছু বলল না। মাথার নিচে বালিশ টেনে ঘুমিয়ে পড়ল না বলা গল্পের আড়ালে।
কখন জানি ঝিনুক আর সানাই হারিয়ে গেল স্বপ্নের ভিড়ে। ঝিনুক স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সানাইয়ের হাত ধরে ধর্মদহ প্রাইমারি স্কুলের বড় আমবাগানে গিয়েছে। পাশেই বিশাল ফুলবাগান। ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ছে। ছোট্ট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে। কেউ দড়ি খেলছে,কেউ ধরাধরি খেলছে।ওদের মধ্যে আবার বৃষ্টি, শিলা,জেসমিনও আছে।সবাই আনন্দে মেতে আছে। সবার ঠোঁটে হাসির বাহার। সবাইকে দেখে সানাই ঝিনুকের হাত ছেড়ে দিয়ে এক দৌড়ে চলে গেল। সবার মাঝে খেলতে।ঝিনুক এগিয়ে গেল। বলল,আমিও তোমাদের সাথে খেলব।
কিন্তু কেউ তাকে খেলতে নিল না। সবাই বলল,তুমি খুব ঝগড়াটে, তোমাকে খেলতে নিলে আমাদের খেলার বারোটা বেজে যাবে। আমাদের সাথে খেলতে হলে ফুরফুরে মন লাগবে। তোমার মনটা হিংসুটে।
এই কথা শুনে ফট করে তার মুখ কালো হয়ে গেল।মনটা বিষাদে ভরে গেল। খুব অপমানবোধ হলো ঝিনুকের। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল ঝিনুকের। সে ভাবতে লাগল, সত্যি আমি এমন? আমি কি সবার মত ভালো হতে পারি না? আমিও ভালো হবো।সানাইকে আর কখনো বকা দেব না। দুইবোন মিলেমিশে খেলব। তাহলে আমাদের সবাই ভালোবাসবে,,,,


No comments:
Post a Comment
no spam