ঘুম-ছোট গল্প



ঘুম,,

মোঃ তোফায়েল হোসেন,,


জামান ঘন্টাখানেক আগেই বোনাসের টাকাটা হাতে পেয়েছে। ভাবছে- অফিস থেকে ফেরার পথেই পরীর জন্য একটা ভালো শাড়ি কিনে নেবে। জামান আর পরীর সংসারের বয়স এই তো গতকাল চার মাস অতিক্রম করলো। খুব মধুময় সময় অতিবাহিত হচ্ছে জামানের। নিঃসঙ্গ মানুষ ছিল সে। পরী এসে তার একাকীত্ব দূর করে জীবনের স্বাদ পাইয়ে দিয়ে সকল ধ্যান ধারনাকে সম্পর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছে। জামানের কাছে এখন মনে হয়- তার জীবনটা শুধুই পরীময়।
আজ অফিস থেকে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আগেই বেরিয়ে পড়লো জামান। যমুনা পাম্পের টার্নিংটা ঘুরে ললনা বস্ত্রালয়ের সামনে বাইকটা থামাতেই দেখল একটা বিরাট জটলা। বাইকটা স্ট্যান্ড করে এগিয়ে গেল সে। একজনকে প্রশ্ন করলো- কি হয়েছে? উত্তরে এক বয়স্ক লোক বললো- এক্সিডেন্ট হয়ে ভাই; এক্সিডেন্ট! মেয়েটাকে পিছনে নিয়ে ছেলেটা বেপরোয়াভাবে বাইকটা নিয়ে মোড় ঘুরেই ফাঁকা রাস্তায় হঠাৎ করে লাইটপোস্টের সাথে ধাক্কা খেয়ে উল্টে গেল।
জামান ততক্ষণে জটলার কেন্দ্রে পৌঁছে গেল। অচেনা রক্তাত এক যুবকের নিথর দেহ পড়ে আছে ফুটপাতে। এক পলক দেখেই বুঝা যায়- পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে সে। অদূরে পড়ে থাকা মেয়েটাকে দেখেই পাথর হয়ে গেল সে। এ যে পরী!
একটা গাড়ি ডেকে অচেতন পরীকে তাতে উঠিয়ে রওয়ানা হওয়ার আগেই পুলিশ এসে গেল ঘটনাস্থলে। তারা পরীকে দেখেই তাড়াতাড়ি হাসপাতাল পৌঁছার তাগিদ দিল। জামান পরীকে নিয়ে ছুঁটলো। ডাক্তারের হাতে তাকে তুলে দেয়ার পরপরই জামানের মাথায় হাজার প্রশ্ন ভিড় করতে লাগল। পরীর তো এমন কোন আত্মীয় ছিলনা- যাকে জামান চেনে না। তাছাড়া এ শহরে জামান আর পরীর আপনজন কেউ নেই। তাহলে কে এই অচেনা যুবক? পরী তার অজান্তে কোথায় গিয়েছিল এ যুবকের সাথে? কেন গিয়েছিল? কি তাদের সম্পর্ক? এ রকম কতদিন ধরে চলছে? আজ পরীর সাজ-গোজ কেনইবা এত চকচকে?
তাকে ভাবনার অতল থেকে তুলে আনলেন ডাক্তার। জানালেন- আপনার স্ত্রী’র জ্ঞান ফিরেছে তবে তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। আরও দুঃখজনক হলো- প্রচন্ড আঘাতে আপনার স্ত্রী’র গর্ভপাত হয়ে গেছে।
ডাক্তারের প্রথম কথা জামানের জন্য কষ্টদায়ক হলেও দ্বিতীয়টা বেশি আঘাত করলো থাকে। তারা স্বামী স্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জামান প্রোটেকশন নিচ্ছে বিয়ের রাত হতেই। তা হলে পরী কিভাবে অন্তসত্ত্বা হয়?
রাত প্রায় দশটা বাজে তখন। ঘুমের ঔষধ দিয়ে পরীকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আত্নীয়-স্বজনদের জানানো হয়েছে ঘটনাটা। তারা এতটাই দূরে- আসতে ভোর হয়ে যাবে। জামান উত্তরবিহীন প্রশ্নে বিধ্বস্ত! তাই চুপচাপ বেরিয়ে আসে রাস্তায়। রওয়ানা হয় পুলিশ স্টেশনের উদ্দেশ্যে।
অফিসার ইনচার্জ জানান- মৃত ব্যক্তির নাম জামান চৌধুরী। তার আর কিছুই জানা সম্ভব হয়নি। যুবকের সঙ্গে থাকা পরিচয়পত্রে যে ঠিকানা দেয়া ছিল পুলিশ সেখানে তার ছবি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে চেনে এমন লোক এ তল্লাটে একজনকেও পায়নি। প্রশ্নরা আবারও ভিড় করতে লাগলো জামানের মস্তিষ্কে। তবে কি পরী তার সাথে প্রতারণা করলো? কিভাবে পারলো সে এমন নোংরা হতে? জামান ভেবে পায়না- তার ভালোবাসার মানুষটি কিভাবে প্রতি রাতে তাকে বাসি শরীরে পূঁজা দিত? জীবনের হাজার প্রশ্ন, প্রশ্নের মাঝখানে আবার প্রশ্ন!
রাত বারোটার দিকে হাসপাতালে ফিরে এলো জামান। ফার্মেসী থেকে কেনা জিনিসগুলি খুব যতনে পকেটে চেপে ধরে ঢুকে গেল পরীর কেবিনে। পরী নিথর হয়ে ঘুমাচ্ছে। প্রয়োজন হলে ডাকবে- এ কথা বলে কর্তব্যরত নার্সকে জামান বিদায় দিয়ে দিল।
ঘন্টাখানেক পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডাকতে বাধ্য হয়েছিল। পরীর বন্ধ কেবিনের দরজা ভাঙ্গতে হয়েছিল পুলিশকে। দরজা ভাঙ্গার পর সবাই দেখলো- জামান পরীর বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। দু’জনের এ ঘুম কেউ আর কোনদিন ভাঙ্গাতে পারবে না। পুলিশ জামানের হাতে একটা খালি সিরিঞ্জ আর দু’জনের শরীরে বিষ পেয়েছিল। সবার অজান্তে সে রাতে জামানের প্রশ্নগুলো ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাতের দ্বি-প্রহরেই পুলিশের প্রশ্নগুলো জেগে উঠেছিল। কেবিনে তৃতীয় কারও উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল তারা। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল- মধ্যরাতে জামান চৌধুরী নামের সেই যুবক এসেছিল হাসপাতালে এবং বিশ মিনিট পর সে যে বেরিয়ে গিয়েছিল তাও!

join us on- telegram


No comments:

Post a Comment

no spam

 

Copyright © 2016 - | World Books Collect | All Right Reserved| Design by MAS web| Mumbai, India| e-mail:- contact@masexim.in