কেমন আছে স্কুলটা,,
- জুয়েল আশরাফ,,
সকাল নয়টা থেকে স্কুল শুরু। তাই স্কুলে পৌঁছানোর জন্য আটটা থেকেই তৈরি হয় সাফা। ঘড়ির কাঁটা আটের ঘরে ছুঁলেই স্কুলের জামা নিয়ে সাফা এগিয়ে আসে মায়ের কাছে। তাকে পরিয়ে দিতে হবেই। সাফাকে কিছুতেই মা-বাবা বোঝাতে পারেন না যে, বন্ধ রয়েছে স্কুল।
সাফা তেমন ভাবে এখনও হাঁটতে পারে না। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার সময় হলেই তার বাড়তে থাকে অস্থিরতা। মাকে বারবার দরজা দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এ বার স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। মা নানা কথায় বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, স্কুল বন্ধ। কিন্তু সাফাকে বোঝানো খুব সহজ কাজ নয়। উল্টো মাকেই বুঝিয়ে ব্যর্থ হয়ে চলে আসে বড় বোনের কাছে। তার বড় বোন মারুয়া স্কুলে পড়ে। বড়বোনকে সাথে নিয়ে যাবে স্কুলে। সে বড়বোনের কাছে এসে বলে, ইশকুলে যাব। আমাকে ইশকুলে নিয়ে চলো।
মারুয়া বলল, 'স্কুল তো বন্ধ সাফামনি।'
'ইশকুল বন্ধ হবে কেন? ইশকুলের কি অসুখ করেছে?'
মারুয়া হাসে। বলে, 'না সাফামনি স্কুলের অসুখ করেনি।'
সাফা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে কেমন আছে আমাদের ইশকুলটা?'
আজকাল মারুয়ার মনেও এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে- স্কুলটা কেমন আছে? প্রায় তিন মাস হল, ঘরবন্দি তারা দুই বোন। কতদিন স্কুল দেখেনি। মারুয়া স্বপ্নেও ভাবেনি যে এমন একটা দিন আসতে চলেছে, যখন স্কুলে ফেরার আর বাস্তবের ক্লাসরুমে পড়ানোর জন্য তার এমন আকুল অপেক্ষা করতে হবে। কখনও ভাবতেও পারেনি লকডাউনের আগে যে স্কুলজীবনকে সে জানতো, চিনতো, তাকে কবে আবার ফিরে পাবে।
ইদানিং অনলাইন ক্লাশ হচ্ছে। মা বলেন স্কুলটাকে 'ভার্চুয়ালি' চালাতে চেষ্টা করছে। মারুয়াদের স্কুলের স্যারেরা নতুন উদ্যমে নিজেদের গড়ে নিয়েছেন। দ্রুত শিখে নিয়েছেন কীভাবে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে অনলাইন ক্লাস চালাতে হয়, মেল, হোয়াটসএ্যাপের মাধ্যমে ওয়ার্কশিট, ছোট শিক্ষামূলক ভিডিয়ো বা প্রশ্নপত্র পাঠাতে হয়। ট্যাবলেটের সাহায্যে বিভিন্ন বিষয় শেখা ছাড়াও বাচ্চারা নানা রকম শিল্পকর্ম, গানবাজনার বিভিন্ন অনুষ্ঠান ইন্টারনেটে তুলে ধরছে, অভিভাবকরাও বাচ্চাদের নানা রকম আ্যাক্টিভিটি-র ভিডিয়ো বানিয়ে শিক্ষকদের কাছে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, মারুয়া বেশিক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে পারে না। চোখের পাতা কেমন লাফিয়ে ওঠে। মারুয়া অন্য আরও একটা সমস্যা খুব কষ্টের সঙ্গে উপলব্ধি করছে, যাদের দামি মোবাইল নেই, অথবা অনলাইনে ক্লাশ করার জন্য যেসব মোবাইল দরকার হয়। তার বান্ধবী আয়েশা খুবই ভাল ছাত্রী। ক্লাশের ফার্স্ট গার্ল। কিন্তু ওরা খুব গরীব। ওর বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায়। বাসায় স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নেই। একটা স্মার্ট ফোন কেনার ওদের সামর্থ্য নেই। করোনাভাইরাসের কারণে কারোর বাসায় গিয়ে সাহায্যও নিতে পারবে না সে। ক্লাশ না করতে পারলে বন্ধুদের কাছ থেকে পিছিয়ে পড়বে ও। মন ভেঙ্গে পড়বে ওর। মাকে আয়েশার কথা বলেছিল মারুয়া। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'শিক্ষার বৈষম্য দূর করা উচিত।'
আসলে, গোটা দুনিয়াটাই এখন ভয়ানক অস্থির। মারুয়া অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে স্কুল জীবনে ফিরে যেতে। স্কুল মাঠে খেলা, বন্ধু বানানো, শিক্ষকদের কাছে বকুনি, দুষ্টুমি, স্কুলের বিভিন্ন ফাংশন, 'ফেস্ট'-এ অংশ নেওয়া, টিফিন ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ, বন্ধুর হাত ধরে হাঁটার খুশি, টান টান লড়াইয়ের টিম গেম-এর উত্তেজনা বা বই দেওয়া-নেওয়া সবকিছুকে সে তীব্র ভাবে মিস করছে।
মাথার ওপর ঝকঝকে নীল আকাশ আর পাখির কলতান সত্ত্বেও স্কুলের ছবিটা মারুয়ার মনে ভেসে বেড়ায়। সে মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে, 'স্কুল তুমি ভালো থাকো। পৃথিবীর অসুখ সেরে গেলেই আমরা আবার তোমার কাছে ফিরে আসবো।'


No comments:
Post a Comment
no spam